নব্বইয়ের দশকের BTV’র দুরন্ত পর্দার জনপ্রিয় সব কার্টুন

0
443

বয়স বাড়ার সাথে সাথে যান্ত্রিকতার এই যুগে এসে আর শোনা হয় না রুপকথার গল্প, দেখা হয় না আলীবাবা ও চল্লিশ চোর। ছোটবেলার সেই দুরন্তপনায় কাটানো দিনগুলো কখনই ভোলা সম্ভব নয়। ভোলা সম্ভব নয় দুরন্ত পর্দায় জনপ্রিয় সব কার্টুন গুলো, যা দেখে কেটেছে আমাদের শৈশব-কৈশোর। সপ্তাহ ঘুরে বিটিভির পর্দায় জুমাঞ্জি কিংবা কার্টুন নেটওয়ার্কের টম এন্ড জেরী সবাই দেখার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম টিভির সামনে। এখনো কানে বাজে মজার মজার সেইসব ডায়ালগ আর মিউজিকগুলো। তো দর্শক ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছেন আমাদের আজকের আয়োজন কি নিয়ে সাজিয়েছি… তো কথা না বাড়িয়ে চলুন শুরু করা যাক।

টম এবং জেরী

বিড়াল এবং ইঁদুরের বাস্তব বৈরি সম্পর্কের কথা সবাই জানে। নীলাভ-ছাই রঙের একটি পোষা বিড়াল টম আর বাদামী রঙের একটি ইঁদুর জেরি। সারাক্ষণ দুজনের মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে মারামারি লেগেই থাকে । একটু বোকা স্বভাবের টম, আবার অন্যদিকে জেরি হল যেমন চালাক তেমনি দুষ্টু। সারাক্ষণ দুজনের মারামারিতে কখনো টম জিতে আবার কখনো জেরি। উইলাম হানা এবং জোসেফ বারবারা এই সম্পর্কটাকে মধুর আবার মারামারি, কাটাকাটি অবস্থায় উপস্থাপন করেছেন ‘টম এন্ড জেরি’ কার্টুনের মধ্য দিয়ে। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সের মানুষের কাছে খুবই পরিচিত একটি কার্টুন টম এন্ড জেরি। এত বড় হয়ে গেছি তারপরও এই কার্টুনটি দেখলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। জনপ্রিয় এই কার্টুনটি থিয়েটার হলে প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৯৪০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। সে সময় থেকেই টম এন্ড জেরী টেলিভিশনের পর্দায় রাজত্ব করে আসছে। শৈশবের দিন গুলোকে অনেকখানি আনন্দময় করে তোলার জন্য টম এবং জেরী দুজনেরই একটা বিশাল ধন্যবাদ প্রাপ্য।

গডজিলা

আমাদের দেশের আশি, নব্বইয়ের দশকে জন্মানো মানুষগুলোর জন্য বিনোদনের একমাত্র উৎস ছিলো বিটিভি। প্রতি মঙ্গলবার বিটিভির পর্দায় প্রচারিত হত দ্য গডজিলা সিরিজ। গডজিলা দেখা ছাড়া মঙ্গলবারটা যেন পূর্ণই হত না। গডজিলা হলো অনেকটা ডাইনাসোরদের মতো দেখতে প্রাণী, যা শত শত বছর পর জেগে ওঠে সাগরের তলদেশ থেকে। অ্যাকশন, সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার ঘরানার এই কার্টুনটি পঞ্চাশের দশকে জাপানের তোউহো স্টুডিও সিরিজটি বানিয়েছিল। শুরুর দিকে গডজিলাকে শুধুমাত্র দানব এবং মানবজাতির শত্রু হিসেবে দেখানো হলেও ষাটের দশকের পর থেকে গডজিলা কে মানবজাতির পরম বন্ধু হিসেবে দেখা গেছে। এই কার্টুনের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে ‘গডজিলা’ নামে সিনেমাও বানানো হয়েছে।

মোগলি

জঙ্গলের বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর সঙ্গে মানব সন্তান মোগলির বেঁচে থাকার গল্পের পটভুমিতে নির্মিত হয়েছিলো দ্য জঙ্গল বুক। দ্য জঙ্গল বুক আসলে একটি ভারতীয় ছেলের কাহিনি, যে জঙ্গলে নেকড়েদের মধ্যে থেকে বড় হয়। মধ্য ভারতের জঙ্গলে যার একজন নেকড়ে বাবা, মা ও ভাইবোন ছিল। মোগলি নামের সেই বাচ্চা পশুদের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার করে বেড়ায়। বিশেষ করে তার সঙ্গে থাকে বাঘিরা, ব্ল্যাক প্যান্থার, একটা ভাল্লুক আর মোগলির শত্রু শের খান। বনে মোগলির অনেক বন্ধু ছিলো যারা কিনা ভয়ংকর সব প্রাণী। ভারতীয় জঙ্গলের মোগলির রোমাঞ্চকর এই গল্পটি রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে বাস্তব ও অ্যানিমেশনের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছিলো। দ্য জঙ্গল বুক শুত্রবার সকালে বাংলায় ডাবিং করে প্রচারিত হতো।

ডোরেমন

হামে এক দুসরে সে নাহি মিলনা চাহিয়ে …  মা, মুঝে এক চকলেট খিলা দো; —এসব কথা ইদানিং আর রাস্তাঘাটে অপরিচিত নয়। বিশেষ করে শিশুদের আনাগোনা আছে, এমন বেশিরভাগ জায়গাতেই দেখা যাবে বাবা-মায়ের কাছে সাধারণ চকলেট-চিপস কেনার আবদারেও ভাঙাচোরা হিন্দি বলছে শিশুরা।  বলছিলাম ছোটদের পছন্দের ডোরেমন কার্টুনের কথা । বিখ্যাত জাপানি কার্টুনিস্ট ফুজিকো এই কার্টুনটি প্রথম কমিকস আকারে প্রকাশিত করে ১৯৬৯ সালে। ১৯৭৩ সালে প্রথম একে অ্যানিমেশন কার্টুনে রূপ দেওয়া হয়। ডোরেমন , নোবিতা নোবি , শিযুকা মিনামোতো , তাকেশি “জিয়ান” গৌদা  এবং সুনিও হোনেকাওয়াকে নিয়ে কার্টুনটির গল্প । সাম্প্রতিক সময়ে কার্টুনটি এত বেশি জনপ্রিয়তা পায় যে পুতুল থেকে শুরু করে পেনসিল, জামা-কাপড়, ব্যাগ এমন কিছু নেই যাতে তার উপস্থিতি নেই। এমনকি সর্বশেষ চালু হয়েছে ‘ডোরেমন স্কুল’ পর্যন্ত!

মিকি মাউস

পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর মনোজগতে যে কয়টি চরিত্র গভীরভাবে দাগ কাটে আছে  তার মধ্যে রয়েছে কার্টুন চরিত্র মিকি মাউস। আজকের দিনে এমন কোনো শিশু কি আদতেই পাওয়া সম্ভব যে টেলিভিশন দেখেছে কিন্তু, মিকি মাউস দেখেনি। ছোট শিশু বার্ধক্যে পৌঁছে যাচ্ছে কিন্তু, মিকি মাউস-ই শুধু বুড়ো হয় না। জেনে অবাক হবেন যে ওয়াল্ট ডিজনি’র বিশ্বখ্যাত চরিত্র ‘মিকি মাউস’ বিরানব্বই বছরে পা দিতে চলেছে । কার্টুনিস্ট অব আইওয়ার্কস-এর সঙ্গে মিলে ‘মিকি মাউস’ চরিত্রের সৃষ্টি করেন প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ওয়াল্ট ডিজনি। মিকি মাউস সর্বকালের প্রথম কার্টুন চরিত্র যে কিনা কথা বলতে পারতো এবং সর্বপ্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করেছিল তা হল – Hot Dog !! এটি এমন একটি চরিত্র যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নির্মল আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে সকলকে। সবাই যে শুধু মজা করার জন্য দেখেছেন বা ঘরের ছোটমনিদের দেখিয়েছেন তা-ও কিন্তু নয়৷ মিকি মাউস শিশুর বিকাশ এবং শিক্ষার ক্ষেত্রেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে ৷ মিকি মাউস ক্লাবহাউসর প্রতিটি পর্বে শিশুদের বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করা হয়েছে । ইঁদুর মহানায়ক মিকি, ইঁদুর নায়িকা মিনি, হাঁসরাজ ডোনাল্ড ডাক আর তাঁর প্রেমিকা ডেইজি ডাক-এর নানান কাণ্ডকীর্তির পরতে পরতেই রয়েছে হাসি এবং এই হাসতে হাসতেই ছলে বলে কৌশলে অনেক কিছু শেখানো হয়েছে ছোট্ট সোনামণিদের ।

পপাই দ্য সেইলর ম্যান

পড়াশোনার ফাঁকে এই আধা ঘণ্টার কার্টুন শো-ই ছিল জীবনে স্বস্তির এক ঝলক। ‘আই অ্যাম পপাই দ্য সেইলর ম্যান’ থিম সং গাওয়া আর স্পিনিচ অর্থাৎ বাংলার পালং শাক খেয়ে শত্রুদের সাথে ঢিশুম ঢিশুম করা পপাই চরিত্রটির প্রতি যেন এক ধরনের নেশা ধরে যায়  সকলের।  মার্কিন কার্টুনিস্ট এলিজে ক্রিসলার এই জনপ্রিয় কার্টুনের নির্মাতা।  একটা সময় ছিল যখন কিনা পাপাই হুইফল হেনের মাথায় হাত বুলিয়ে শক্তি অর্জন করতো পরে ১৯৩২ সালে বিষয়টি পরিবর্তন করে পালংশাকের আইডিয়াটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দু-তিন কৌটা স্পিনিচ খেয়ে অবলীলায় সে সুপারম্যানের মতো এক হাতে ট্রাক পর্যন্ত উঁচু করে ফেলতে পারে! তার এই জনপ্রিয়তা কার্টুন চরিত্র থেকে শুরু করে কমিকস বই, ভিডিও গেম, আর্কেড এমনকি বড় পর্দায় পর্যন্ত তাকে স্থান করে দিয়েছে। চলচ্চিত্রে পপাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অস্কার জয়ী অনবদ্য অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস।

সাগারা সানাসুকে

নব্বই দশকে জন্মিয়েছে কিন্তু গালে এক্স আকৃতির কাটা দাগের সেই দুর্ধর্ষ বালকের তলোয়াড়ের কারসাজি আর কুংফু দেখে নি এমন মানুষ বোধয় একটিও খুজে পাওয়া যাবে না । বলছিলাম আমাদের সকলের পছন্দের কার্টুন সাগারা সানাসুকের কথা । বিটিভিতে সম্ভবত রাত দশটার ইংরেজি সংবাদের পরে সামুরাই টিভি সিরিজটি হতো।  এই সিরিজটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ১৮৭৮ সালের জাপানিজ মেইজি পিরিয়ডের কথা। সে সময়ের এক দুর্ধর্ষ তলোয়ার যোদ্ধা কেনশি জাপানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। শান্তি, সংঘর্ষ, প্রেম সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ এই সিরিজটি দেখলে অ্যানিমেশন চরিত্র কেনশির প্রতি মায়া জন্মাতে বাধ্য। কেনশির গল্প নিয়ে পরবর্তীতে দুটি চলচ্চিত্র, মাঙ্গা, অ্যানিমে ফিল্ম সিরিজ সহ ছোট পর্দা, বড় পর্দায় অসংখ্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে।

আমাদের নিত্যদিনের পড়াশোনার ফাঁকে এই স্বল্প সময়ের কার্টুন শো- গুলোই ছিল আমাদের জীবনে স্বস্তির এক ঝলক দমকা বাতাসের মতো। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশী বেশির ভাগ শিশুরই বিনোদনের প্রধান অবলম্বন ছিল গডজিলা , সামুরাই এক্স, পপাই, টম অ্যান্ড জেরি কিংবা  জুমানজি এর মতো কার্টুনগুলো। নব্বইয়ের দশকের মাঝমাঝি সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হয় মীনা কার্টুনের নাম। তখন তো আর এখনকার মতো চ্যানেলের ছড়াছড়ি ছিল না, বিজ্ঞাপনের ভিড়ে মূল অনুষ্ঠান হারিয়ে যাওয়ার আশংকাও ছিল না। তাই শিশুদের সাথে তাদের বাবা-মায়েরাও যে একই কার্টুনে মজে থাকতেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আজকের পর্বে এটুকুই। আসা করি আপনাদের সকলেরই ভাল লেগেছে । আপনার দেখা সবচেয়ে পছন্দের কার্টুন কোনটি কমেন্টবক্সে আমাদের জানিয়ে দিন ।