পৃথিবীর রহস্যে ঘেরা সাত আশ্চর্যের আশ্চর্য কথা

0
136
সপ্তাশ্চর্য  শব্দটির মধ্যেই একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতির ছোঁয়া আছে। মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, পেরুর মাচুপিচু কিংবা চায়নার গ্রেট ওয়াল। আবার কক্সবাজার ও সুন্দরবন চূড়ান্ত তালিকার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই দুইটি স্থান আর নির্বাচিত হয়নি বলে অনেক বাঙ্গালীর মনক্ষুণ হয়েছিলো। তবে বর্তমানের সাতটি স্থানের সবকটিই ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগতভাবে বেশ গুরুত্বসম্পন্ন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগের মতো প্রাচীন যুগও যে রহস্য ও আশ্চর্যে ঘেরা ছিলো তা পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য দিকে তাকালে আচঁ করা যায়। বন্ধুরা আমাদের আজকের এই আয়োজনে থাকছে পৃথিবীর রহস্যে ঘেরা সাত আশ্চর্যের আশ্চর্য কথা।

দ্য গ্রেট পিরামিড গিজা

মিসরের এল গিজা নামক স্থানে নীল নদের পশ্চিম পাড়ে প্রায় ২৫ লক্ষ পাথর খন্ড দিয়ে নির্মিত সপ্তাশ্চর্যের প্রথম আশ্চর্য দ্য গ্রেট পিরামিড গিজা তৈরিতে ২০ বছর সময় লেগেছিলো। এই বিশাল দৈত্যকার পিরামিড তৈরিতে  প্রায় ১লক্ষ শ্রমিক কাজ করেছিলো।  যার নির্মাণ সাল ছিলো খ্রিষ্টপুর্ব ২৫শত বছর পূর্বে। যেনে আশ্চর্যিত হবেন যে সপ্তাশ্চর্যে জায়গা পাওয়া দ্য গ্রেট পিরামিড গিজার উচ্চতা ৪৫২ ফুট। যা পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পিরামিড, প্রথমটি গুয়াতেমালার লা দানতা। যার উচ্চতা ৫৬৫ ফুট। মৃত্যুর পর পরলোকে অনন্ত শান্তির জীবন যাপনের বিশ্বাস থেকেই পিরামিড তৈরি করা হয়েছিলো।  ইতিহাস বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীণ মিসরের চতুর্থ ফেরাউন খুফুর সমাধি এটি। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সময়ে বহু আক্রমণের সম্মুখীন হওয়ায় অনেক অংশ ভেঙ্গে গেছে। তবুও প্রায় ৪হাজার বছর ধরে সগৌরবে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবচেয়ে প্রাচীন মানবসৃষ্ট নিদর্শন পিরামিড গিজা। 

গ্রেট ওয়াল চায়না

Great Wall of China

চীনের মহাপ্রাচীর বা গ্রেট ওয়াল চায়না পৃথিবীর মধ্যযুগীয় সপ্তমাশ্চর্যের একটি। মোট ২১ হাজার কিলোমিটার লম্বা এবং ৪/৫ মিটার চওড়া এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যটি সবাইকেই মুগ্ধ করে। এর স্থাপত্যের কারণে চীনের প্রাচীরটিকে “ড্রাগনের” সাথে তুলনা করা হয়। আজ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর আগে এই মহাপ্রাচীরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজা এই প্রাচীরের বিভিন্ন অংশ তৈরি করেন। বর্তমানে মহাপ্রাচীরের যে অংশগুলো দেখতে পাওয়া যায় তা মূলত মিং ডাইন্যাস্টিতে নির্মিত। দীর্ঘ সময় ধরে পৃথীবির বুকে টিকে থাকা চীনের মহাপ্রাচীরের যথাযথ রক্ষনাবেক্ষণ না করার কারনে এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। মানব ইতিহাসের স্থাপত্য প্রকৌশলীর অন্যতম নিদর্শন এই সপ্তশ্চার্য দেখতে প্রতি বছর ৫ কোটির বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়। 

আরও পড়ুনঃ

পেত্রা নগরী 

Petra Jordan during daytime

ঐতিহাসিক পাথুরে নগরী পেত্রা একটি প্রাচীন আরব শহর। ধারনা করা হয় এটি প্রায় দুই হাজার বছর পুরনো। পেত্রা নামটি গ্রিক শব্দ petros থেকে এসেছে, যার অর্থ পাথর। পাথরের তৈরি বলে এর এমন নামকরণ করা হয়েছে ধারণা করা হয়। বর্তমান জর্ডানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ওয়ারদির  ঠিক পূর্বে হুর পাহাড়ের পাদদেশে এই নগরীটি অবস্থিত। এই অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর নগরীটির গোড়াপত্তন হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে। প্রাচীন এই নগরীটিতে ছিল প্রায় ৩০০০ দর্শক ধারণ ক্ষমতার নাট্যশালা, ছিল ১৫০০ দর্শক ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়াম, প্রায় ১০,০০০ স্কয়ার ফিট আয়তনের একটি বিচারালয়, লাইব্রেরী, সৈন্যদের ব্যারাক সহ আধুনিক নগর ব্যবস্থার অনেক কিছুই। পেত্রা সংস্কৃতি, সম্পদ, ঐতিহ্যে আর ক্ষমতায় কতটা যে উন্নত ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায় এর ধ্বংসাবশেষ দেখেই। ইউনেস্কো একে “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট” বলে ঘোষণা করেছে ১৯৮৫ সালে। ঘোষণায় পেত্রাকে বলা হয়, “One of the most precious cultural properties of man’s cultural heritage”.

কলোসিয়াম

people walking on road near brown concrete building during daytime

রোম সাম্রাজ্যের কালজয়ী নিদর্শন কলোসিয়াম সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম। রোমান সাম্রাজ্যের নিষ্ঠুরতার চরম উদাহরণ এই কলোসিয়াম হাজার হাজার মানুষের রক্ত, আর্তনাদ ও সংশয় নিয়ে এটি দাঁড়িয়ে আছে ইতালির রোম নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে। ইতালির রোমকে বলা হয় চির শান্তির নগরী। কিন্তু ভাবলে অবাক হতে হয় যে, এই কলোসিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটরদের ছেড়ে দেওয়া হত হিংস্র ক্ষুধার্ত পশুর সামনে। লড়ায়ের জন্য উত্তর আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমদানি করা হতো হাজারে হাজারে হাতি, গন্ডার, সিংহ, নেকড়ে, ভাল্লুক, বাঘ এমনকি কুমিরও। যুদ্ধবন্দিদের মরণপণ লড়াই দিয়ে শুরু হত। যতক্ষণ না দুইজনের একজনের মৃত্যু হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত চলত লড়াই। ৫০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই মঞ্চের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ৭০-৭২ খিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে। দশ বছর ধরে প্রায় ৬০,০০০ ইহুদি দাসকে কাজে লাগিয়ে ৮০ খ্রিস্টাব্দে কলোসিয়ামের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। রোমান শাসনামলে নির্মিত এই এম্পিথিয়েটারই ছিল সবচেয়ে বড় থিয়েটার।

মাচু-পিচু

rule of thirds photography of man sitting on rock formation

মানবসৃষ্ট অসাধারণ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি হল মাচু পিচু শহর। পেরুর কাসকোতে অবস্থিত ১৫ শতাব্দীতে রাজা পাচাকুতেক এ নগর গড়ে তোলেন। ১৬ শতাব্দীতে স্প্যানিশরা দখল করার পর শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। স্প্যানিশ আক্রমণের পূর্বে মাচুপিচু ছিল ইনকাদের তীর্থস্থান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ১৯১১ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক হিরাম বিংহাম এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে বিশ্ববাসীর কাছে বৈচিত্র্যময় এ শহরের নান্দনিকতার জানান দেন। দেয়াল পাথর দ্বারা নির্মিত মাচুপিচু অনেক প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যা র স্বাক্ষর বহন করে। পাথরের খন্ড খুব নিখুঁতভাবে কেটে তারপর তাদের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে মাচুপিচুর এই স্থাপনাগুলো বেশ ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। এ কারণেই ইনকাদের এই শহর গত ৪০০ বছরে অসংখ্য ভূমিকম্প সহ্য করেও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার

Christ The Redeemer, Rio Brazil

লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল, সাম্বা নৃত্য, আমাজন বন ছাড়াও ব্রাজিল বিশ্বের বুকে আরেক কারনে বিখ্যাত, আর তা হলো সপ্তাশ্চর্য খ্যাত ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যিশুর বিশাল একটি মূর্তি। মেঘের ফাঁকে ভেসে থাকা একখন্ড কীর্তি যে কারও নজড় কারতে সক্ষম। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও শহরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ যিশুর এই প্রতিকৃতির নাম  ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। ৩৪০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি করা, দৈর্ঘে ৯৮ ফুট উঁচু যিশু খ্রিস্টের এই প্রতিকৃতি টি তৈরি করেন ফরাসি ভাস্কর পল ল্যান্ডোস্কি। আড়াই লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার ভাস্কর্য টি তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল ব্রাজিলের স্বাধীনতার একশ বছর কে স্মরণীয় করে রাখা। 

আরও পড়ুনঃ

চিচেন ইৎজা

gray temple

মায়া সভ্যতার বিস্ময়নগরী চিচেন ইৎজা। প্রাক-কলম্বিয়ান সময়ের মায়া সভ্যতার বৃহত্তম শহরগুলোর একটি এবং প্রত্নতাত্তি্বক শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি মেক্সিকোর ইউকাতান রাজ্যের তিনুম পৌরসভায় অবস্থিত । চিচেন ইৎজা মায়ানদের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর একটি ছিল। চিচেন ইৎজার আক্ষরিক অর্থ ইৎজার কুয়ার মুখে, ইৎজার পরিচয় অবশ্য আজ পর্যন্ত জানা যায় নি। ৭৫ ফিট উচ্চতার অপূর্ব নির্মাণ শৈলীর এই স্থাপত্য ১৩০০ বছর আগে নির্মিত হয়। ভূমিকম্প ও লুটেরাদের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে আজো দাড়িয়ে আছে সগর্বে যেমনটি ছিল হাজার বছর আগেও । এল ক্যাসতিয়ো বা কুকুলকানের পিরামিড নামে পরিচিত এই উপাসনালয় আসলে একটি পাথরের তৈরি মায়ান বর্ষপঞ্জি।  

উল্লেখিত পৃথিবীর বিস্ময় গুলোর ইতিহাস এতই ব্যাপক যে, এই একটি পোস্টে পুরোপুরি তুলে ধরার মতো জায়গার সংকুলান বড্ডো বেশি, তাই চেষ্টা করেছি মোটামোটি তথ্য দেওয়ার। আপনার মতামত কমেন্টবক্সে জানাতে ভুলবেন না। এবং ফেসবুক হোয়াটসএপ ম্যাসেঞ্জারে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ সবাইকে, ভালো থাকবেন।